Monday, 12 Feb 2018 03:02 ঘণ্টা

কারারুদ্ধ জননী; কারারুদ্ধ গনতন্ত্র

Share Button

কারারুদ্ধ জননী; কারারুদ্ধ গনতন্ত্র

নির্মোহ নীলগিরি
সরকার ক্রমাগত একের পর এক তামাশা করে যাচ্ছে । এই তামাশা তারা করছে বাংলাদেশের প্রধান বিরোধী দল বিএনপির সাথে, বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার সাথে, বাংলাদেশের জনগনের সাথে । কিন্তু হীরক রাজার দেশের মতো বাংলাদেশের মানুষের মুখে আজ স্কচটেপ লাগিয়ে রেখেছে । চোখে লাগিয়ে রেখেছে রঙ্গিন চশমা । ‘লাগ ভেল্কি লাগ’ বলে একের পর এক ভেল্কি দেখাচ্ছে । আবাল জনগণকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সরকার একের পর এক দেশ বিরোধী চুক্তি করে যাচ্ছে । আর দেশের মানুষকে গালভরা ফিরিস্তি দিয়ে বলছে বাচ্চালোক তালিয়া বাজাও । তাদের পোষা মাধ্যম গুলো হাততালি দিয়ে মারহাবা মারহাবা করে বলছে ‘ক্যায়া বাত ক্যায়া বাত’ । সকল অন্যায়, দুর্নীতি অনিয়ম হালাল করতে বেহায়া মিডিয়া কিছু নির্লজ্জ ক্লাউন নিয়ে বসে যাচ্ছে লাইভ মস্করা-শো করতে । ছিঃ এরা পারেও বটে !!!
বাংলাদেশে গনতন্ত্র প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ সংগ্রামে ত্যাগ এবং আপসহীন ভুমিকার জন্য দেশবাসীর কাছে সবচেয়ে জনপ্রিয় নেত্রীতে পরিনত হন বেগম খালেদা জিয়া । প্রধানমন্ত্রী হিসাবে এবং বিরোধী দলীয় নেত্রী হিসাবে সুদীর্ঘ সময় তিনি গণতন্ত্র রক্ষার জন্য সংগ্রাম করেছেন । তাঁর এই সংগ্রামের পথ কখনোই মসৃণ ছিলনা । বরং তাঁকে ষড়যন্ত্রের খানাখন্দে ভরা কণ্টকাকীর্ণ দুর্গম পথ পাড়ি দিতে হয়েছে । কোন হুমকি, কোন ষড়যন্ত্র, কোন বাঁধা তাকে থামাতে পারেনি । ইস্পাত কঠোর দৃঢ়তায় তিনি দেশের মানুষের অধিকার রক্ষায় কাজ করে গেছেন । বাংলাদেশের গনতন্ত্র রক্ষায় তাঁর এই সংগ্রামী ভূমিকার জন্য বেগম খালেদা জিয়াকে ২০১১ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউজার্সি ষ্টেট সিনেটর ’ফাইটার ফর ডেমোক্রেসি’ খেতাবে ভূষিত করেন ।
মহাত্মা গান্ধী বলেছিলেন ‘‘আমার কাছে গণতন্ত্র হচ্ছে যেখানে সবচেয়ে র্দূবলতম ব্যাক্তিও সবচেয়ে সবলের সমান সুযোগ পায়।‘‘ সব নাগরিকের সমান অধিকার ও ন্যায় বিচার নিশ্চিত করার চর্চার মাধ্যমেই শুধু গণতন্ত্রের পথে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব। কিন্তু গত কয়েক বছরে এই চর্চা চলেছে কি? গণতন্ত্র শম্ভুক গতিতে হাঁটতে গিয়ে প্রতি পদে হোঁচট খেয়েছে। স্বেচ্ছাচারিতা, একগুয়েমী, আগ্রাসী দমননীতির র্হাডলে প্রতিবার গণতন্ত্র হয়েছে বাধাগ্রস্থ। বতর্মান সরকার র্নিবাচিত সরকারের দোহাই দিয়েছে কিন্তু গণতান্ত্রিক সরকারের আচরনগত পরীক্ষায় পেয়েছে ডাবল জিরো।
গণতন্ত্র হত্যা করতে আর নিজেদের অবৈধ ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে আওয়ামী সরকার বারবার একই নাটক মঞ্চস্থ করে। সেই একই ডায়লগ, একই বুলি। শুধু স্থান আর কালটা ভিন্ন। ২০১৩ সালে ‘র্মাচ ফর ডেমোক্রেসী‘ কমর্সূচী ঠেকাতে বেগম খালেদা জিয়াকে আটকে রাখা হয়েছিলো তার নিজ বাসভবনে আর ‘গণতন্ত্র হত্যা‘ দিবসের কমর্সূচী ঠেকাতে তাকে আটকে রাখা হয়েছিল দলীয় কার্যালয়ে। সেই একই কায়দায় আইন শৃংক্ষলাবাহিনী দিয়ে কয়েক স্তরের বেস্টনী, জলকামান, প্রিজন ভ্যান আর ইট-বালু-সুরকীর ট্রাক দিয়ে রাস্তায় তৈরী করা হয়েছিল ব্যারিকেড। আর ২০১৫ সালে নতুন সংযোজন করা হয়েছিল গেইটে ঢাউস সাইজের একখানা তালা। আর ২০১৮ তে এসে মিথ্যা সাজানো ষড়যন্ত্রমুলক মামলায় সাজা দিয়ে এভাবে সরকার শুধু বেগম খালেদা জিয়াকেই কারারুদ্ধ করেনি, কারারুদ্ধ করেছে গোটা দেশকে, গণতন্ত্রকে।
কর্তৃত্ববাদী সরকার মিথ্যা বানোয়াট মামালায় বেগম খালেদা জিয়াকে জেলে পুরেই ক্ষান্ত হয়নি। গোয়েবলসের মতো ধারাবাহিক ভাবে র্নিজলা মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে নিজেদেরকে করে তুলেছে তামাশার পাত্র। এখন লটারী করে ঠিক করতে হবে যে – মানুষ নিজের চোখকে বিশ্বাস করবে নাকি শেখ হাসিনা এবং তার সভাসদদের কথা বিশ্বাস করবে !
একদিকে বলা হচ্ছে বেগম খালেদা জিয়াকে কারাগারে সবরকম সুযোগ সুবিধা দেয়া হচ্ছে । বাস্তবে আমরা কি দেখছি- সত্তরঊর্ধ একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে রাখা হয়েছে একাকী একটি পরিত্যাক্ত, স্যাঁতস্যাঁতে ভবনে । কোন ডিভিশন দেয়া হয়নি ।
আর ‘হীরক রাজার দেশের’ মতো প্রধানমন্ত্রীর সাথে সুর মিলিয়ে তার সব মন্ত্রীরা বলে চলেছেন- কোথায় আজ খালেদা জিয়া ? জেলে পুরে চোখের আড়াল করলেই তাঁকে মনের আড়াল করা যাবেনা । তিনি আছেন লক্ষ কোটি মানুষের হৃদয়ের মণিকোঠায় ।
৮ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের সাধারন জনগন আবারো ছোট্ট একটি নমুনা দেখিয়েছে যে তারা বেগম খালেদা জিয়ার সাথেই আছে । ১৪৪ ধারা জারি করেও বেগম জিয়ার গাড়ী বহরে গনমানুষের স্রোত আটকাতে পারেনি । ঢাকার অলি গলি রাজপথ থেকে হঠাৎ আসা সুনামির মতো মানুষ আসতে থাকে । তাদের গন্তব্য ছিল একটাই । খালেদা জিয়ার গাড়ী বহর । তারা এসেছিলেন নেত্রীর প্রতি তাদের আনুগত্য, তাদের সহমর্মিতা, তাদের ভালোবাসা প্রকাশ করতে । পুলিশের গ্রেফতার, লাঠিচার্জ, টিয়ার গুলি, ছাত্রলীগ যুবলীগের হামলা ও তাদের ঠেকাতে পারেনি ।
বিচার বিভাগের স্বাধীনতা দেওয়ার ওয়াদা করে ক্ষমতায় আসা আওয়ামী লীগ বিচার বিভাগকে পরিনত করেছে তাদের আজ্ঞাবহ প্রতিষ্ঠানে। স্বাধীন বিচার ব্যবস্থার নামে চলছে সীমাহীন স্বেচ্ছাচারিতা। বিচারের বানী এখন শুধুই নিভৃতে কেঁদে মরে । বিচারের আশায় অসহায় মানুষ আদালতের দ্বারে দ্বারে ঘুরলেও ন্যয় বিচার যেন শুধুই মরিচীকা। বলা হয়ে থাকে আইনের হাত অনেক লম্বা কিন্তু এখানে প্রমানিত হয় সরকার দলীয় প্রভাবের কাছে বাংলাদেশের আইনী ব্যবস্থা পক্ষাঘাতগ্রস্ত, ডিজএইবল।
বর্তমানে বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি সেক্টর দুর্নীতিতে ছেয়ে গেছে । সন্ত্রাসের কালো ছোবল থেকে রেহাই পাচ্ছেনা দেশের একজন মানুষ ও । সরকার দলীয় লোকজনের পাশাপাশি এমনকি সরকারী প্রতিষ্ঠান গুলোও একেকটা সন্ত্রাস আর দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে আর সরকার এক্ষেত্রে উটপাখির নীতি গ্রহণ করেছে । কিন্তু সমস্ত আবহাওয়া রিপোর্টকে ভুল প্রমানিত করে হঠাৎ আসা টর্নেডোর মতো, যত ঝড় ঝাপটা বিরোধী দলের নেতা, কর্মী, সমর্থক এমনকি তাদের আত্মীয় স্বজনদের উপর দিয়ে যাচ্ছে । জেল-জুলুম, নির্যাতনতো রয়েছেই, এমনকি তাদের হত্যা, গুম খুন করতেও দ্বিধা করছেনা । কোন একটা অপকর্মের ঘটনা ধামাচাপা দেয়ার সবচেয়ে সহজ সমাধান বিরোধী নেতাকর্মীদের ক্রসফায়ার দেয়া । এ হচ্ছে এক ঢিলে দুইপাখি মারার সবচেয়ে সহজ সমাধান বটিকা । ইস্যু ধামাচাপার সাথে সাথে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের ক্রসফায়ারের ভয় দেখিয়ে তাদের মুখ বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে ।
উন্নয়নের নামে যেখানে দেশে চলছে অবাধ লুটপাটের মহোৎসব আর বিচারের নামে চলছে প্রহসন, যেখানে সরকার ব্যতিব্যস্ত রয়েছে ইন্ডিয়া তোষণে আর সরকারি নেতাকর্মীরা ব্যস্ত রয়েছে নিজ নিজ উদরপূর্তিতে। শুধুমাত্র হয়রানি করার হীন উদ্দেশে বৃহৎ সরকারী ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে দুদক নামক পচা শামুকের দ্বারা দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নামে মিথ্যা মামলা সাজিয়ে সাজা দেয়া হয়েছে । বেগম জিয়াকে চার দেয়ালে আটকে রাখলে, মানুষের মনে সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ আর ঘৃণা শুধু বাড়বে বৈ কমবেনা । তাই অবিলম্বে তাঁর মুক্তির দাবী জানাচ্ছি ।
ক্ষমতাকে আরো দীর্ঘায়িত করতে যা যা করা দরকার র্কোটের মাধ্যমে হালাল করিয়ে নিচ্ছে সরকার। যাকে যে ভাবে দমানো দরকার,কন্ঠরোধ করা দরকার ,রুলজারির মাধ্যমে তার বাস্তবায়ন করছে তারা। র্কোট কেন রাজনৈতিক দলের হাতিয়ার হবে ? যাত্রাপালার সংয়ের মতো অতি উৎসাহী কিছু বিচারপতির কারনে বিচারালয় দলীয় অংগ সংগঠনের আদলে কাজ করছে। আর রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালীন সময়ে ছাত্রলীগের ক্যাডার এই বিচারপতির কাছে খালেদা জিয়ার ন্যায়বিচার পাওয়া বাতুলতা মাত্র । ছাত্রজীবনে শেখ হাসিনার পরিক্ষিত সৈনিক খালেদা জিয়ার বিরুধে অন্যায় রায় দিয়ে বিচারপতির পরীক্ষায় গোল্ডেন এ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছেন । এবার শুধু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছ থেকে গোল্ড মেডেল পাবার অপেক্ষা ।
সরকার ভাবে তাদের ভুজুং ভাজুং বাংলাদেশের মানুষ বোঝেনা। আইনী জুজুর ভয় দেখিয়ে ,একপ্রকার চিপে ধরে জনগনের মুখ বন্ধ করে রাখছে সরকার। সেদিন আর বেশী দূরে নেই যেদিন জেগে উঠবে লক্ষ কোটি জনতা । বিচারপতি তোমার বিচার করবে যারা একদিন জাগবেই সেই জনতা। এই জনতা।
লেখকঃ লন্ডন প্রবাসী সাংবাদিক ।

এই সংবাদটি 1,079 বার পড়া হয়েছে