Thursday, 26 Apr 2018 04:04 ঘণ্টা

গাজীপুর ও খুলনা সিটি নির্বাচন নিয়ে আওয়ামী লীগের ভাবনা

Share Button

গাজীপুর ও খুলনা সিটি নির্বাচন নিয়ে আওয়ামী লীগের ভাবনা

প্রতীক বরাদ্দের পর জোরেশোরে প্রচারণায় নেমেছেন প্রার্থীরা। পোস্টারে ছেয়ে গেছে গাজীপুর শহর। গতকাল টঙ্গী কলেজগেট এলাকায়।   প্রথম আলো

  • খুলনা-গাজীপুর সিটি নির্বাচন
  • কেন্দ্রীয় নেতাদের দৌড়ঝাঁপের চেয়ে মাঠের শক্তির ওপর ভিত্তি করে জিততে চায় আ. লীগ।
  • স্থানীয় বিরোধ মিটিয়ে একত্রে কাজ করার ওপর জোর।

গাজীপুর ও খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে জাতীয় রাজনীতির আমেজ চলে আসুক—এটা চায় না সরকারি দল আওয়ামী লীগ। বরং স্থানীয় সমস্যা এবং স্থানীয় উন্নয়নে গুরুত্ব দিতে চায় তারা। ঢাকঢোল পিটিয়ে কেন্দ্রীয় নেতাদের দৌড়ঝাঁপের চেয়ে মাঠের শক্তির ওপর ভিত্তি করেই এই দুই সিটি জিততে চায় আওয়ামী লীগ। এ জন্য স্থানীয় বিরোধ মিটিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার ওপর বেশি জোর দিয়েছেন দলের নীতিনির্ধারকেরা।

এই দুই নির্বাচনের পরিকল্পনায় যুক্ত দায়িত্বশীল সূত্রের সঙ্গে কথা বলে এই কৌশল জানা গেছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, জাতীয় রাজনীতির আমেজ এলেই দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকার কারণে যে সরকারবিরোধী মনোভাব কাজ করে, এর প্রভাব পড়ে। অতীতে সিটি নির্বাচনের অভিজ্ঞতা এমনটাই। এ জন্য বড় নেতাদেরও বেশি করে প্রচারে না পাঠানোর পরিকল্পনা আছে দলটির। গত বছর দেড়েকের মধ্যে নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা ও রংপুর সিটি করপোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এসব নির্বাচন নিয়ে বড় প্রশ্ন ওঠেনি। জাতীয় নির্বাচনের আগে বদনাম এড়াতে খুলনা ও গাজীপুরের ভোটও এমনটাই করার পরিকল্পনা রয়েছে।

গাজীপুর ও খুলনায় ভোট গ্রহণ হবে আগামী ১৫ মে। খুলনায় আওয়ামী লীগের প্রার্থী করা হয়েছে সাবেক মেয়র তালুকদার আবদুল খালেককে। আর গাজীপুরে প্রার্থী মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম। এই দুই সিটিতে দলীয় প্রতীকে ভোট হবে।

আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী সূত্র বলছে, গাজীপুর ও খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ফলাফল দুটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করবে। প্রথমত, জাতীয় রাজনীতির প্রভাব কতটা পড়ছে। দ্বিতীয়ত, দলের নেতা-কর্মীরা কতটা ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করতে পারছেন। ওই সূত্র বলছে, সিটি করপোরেশন নির্বাচনে জাতীয় নির্বাচনের প্রভাব পড়ে—অতীতে তা প্রমাণিত। আর দলীয় প্রতীকে ভোট হওয়ায় এই প্রভাব আরও বেশি পড়ছে। এ জন্য জাতীয় বিষয় এড়িয়ে স্থানীয়ভাবে সরকার যেসব কাজ করেছে, সেগুলোই প্রচার করা হবে বেশি।

দলের ওই সূত্রের মতে, দুই সিটিতেই সদ্য সাবেক মেয়র বিএনপির ছিলেন। তাঁদের ব্যর্থতাও তুলে ধরা হবে। পাশাপাশি সরকারি দলের প্রার্থী জয়ী হলে বেশি নাগরিক সুবিধা পাওয়া যাবে—এমন প্রচার করা হচ্ছে।

জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলী ও স্থানীয় সরকার মনোনয়ন বোর্ডের সদস্য ফারুক খান প্রথম আলোকে বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনে স্থানীয় সমস্যা এবং সেগুলোর সমাধান বেশি গুরুত্ব পাওয়া উচিত। আর এলাকায় স্থানীয় নেতা-কর্মীদের আবেদনই বেশি থাকে। তাই এই নির্বাচনে জাতীয় আমেজ দেওয়ার মানে নেই। এ জন্য আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় নেতাদের চেয়ে স্থানীয় নেতাদের চাঙা ও ঐক্যবদ্ধ করার ওপরই বেশি জোর দিচ্ছে।
তালুকদার আ. খালেক, জাহাঙ্গীর আলমতালুকদার আ. খালেক, জাহাঙ্গীর আলম
আওয়ামী লীগের স্থানীয় সূত্রগুলো বলছে, দুই সিটিতেই দলীয় কোন্দল প্রবল। খুলনায় তালুকদার আবদুল খালেককে অনেকটা জোর করেই প্রার্থী
করা হয়েছে। কারণ, স্থানীয় নেতারা তাঁর ব্যাপারে এককাট্টা ছিলেন। কিন্তু সংসদ সদস্য পদ ছেড়ে প্রার্থী হওয়ার বিষয়ে তিনি ততটা আগ্রহী ছিলেন না। এ জন্য দলীয় মনোনয়ন ফরম সংগ্রহ করেননি। শেষ মুহূর্তে দলীয় প্রধান তাঁকে প্রার্থী করার সিদ্ধান্তের কথা জানান। এর মূল কারণ ছিল কোন্দল এড়ানো। পাশাপাশি তাঁর রাজনৈতিক অভিজ্ঞতাও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে গাজীপুরে দলের আগ্রহী প্রার্থী ছিলেন অনেক। অপেক্ষাকৃত অভিজ্ঞ আজমত উল্লাহ খানকে বাদ দিয়ে জাহাঙ্গীর আলমকে মনোনয়ন দেওয়ার কারণে অনেকেই নাখোশ। ফলে প্রকাশ্যে না হলেও দলে কিছুটা দ্বন্দ্ব-কোন্দল আছে। জাহাঙ্গীর আলমকে প্রার্থী করা ঠিক হয়েছে কি না, তা নিয়ে এখনো দলে বিতর্ক আছে। তবে মনোনয়ন-পূর্ব জরিপে তাঁর এগিয়ে থাকা এবং দীর্ঘদিন ধরে মেয়র পদে নির্বাচন করার লক্ষ্য নিয়ে মাঠে থাকায় তাঁর ওপর ভরসা করা হয়েছে।

আওয়ামী লীগের স্থানীয় সরকার মনোনয়ন বোর্ড সূত্র বলছে, কেন্দ্র থেকে সাধারণত প্রার্থী মনোনয়ন দিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়। কিন্তু এবার স্থানীয় সরকার মনোনয়ন বোর্ডের বৈঠকে গাজীপুর ও খুলনার প্রার্থী ঠিক করার পর আলাদাভাবে এই দুই জেলা ও মহানগরের নেতাদের নিয়ে বৈঠক করেন দলীয় প্রধান শেখ হাসিনা। আগামী জাতীয় নির্বাচনের আগে অনুষ্ঠিত এই ভোটের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার নির্দেশনা দেন। ওই বৈঠকে উপস্থিত একাধিক নেতা জানান, দলীয় প্রার্থীর পক্ষে কাজ করার বিষয়ে নেতাদের প্রতিজ্ঞা করানো হয়।

২০১৬ সালের ডিসেম্বরে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে সেলিনা হায়াৎ আইভী পুনরায় মেয়র নির্বাচিত হন। গত বছরের মার্চে কুমিল্লার নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থী মনিরুল হক মেয়র হন। আর গত ডিসেম্বরে রংপুরে জয়ী হন জাতীয় পার্টির গোলাম মোস্তফা। তিনটি নির্বাচন নিয়েই বড় প্রশ্ন ওঠেনি।
জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য আবদুর রাজ্জাক প্রথম আলোকে বলেন, আওয়ামী লীগই উন্নয়ন করতে পারে—এটা মানুষ বুঝে গেছে। ফলে দুই সিটিতেই জয়ের আশা করছেন তাঁরা। আর প্রার্থীও বাছাই করা হয়েছে জনমত ও অভিজ্ঞতা বিবেচনা করে।

কেন্দ্রীয় কমিটি হয়েছে, তবে ঢাকঢোল নয়
আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী একটি সূত্র জানায়, এবার মাঠের শক্তির ওপর বেশি জোর দেওয়া হয়েছে। এ জন্য কেন্দ্রীয় নেতা বা সহযোগী সংগঠনের বড় নেতাদের বেশি বেশি নির্বাচনী এলাকায় যাওয়ার বিষয়ে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে। কারণ, এতে করে প্রার্থী ও তাঁর কর্মীদের কেন্দ্রীয় নেতাদের ‘খেদমত’ করতে গিয়ে সময় নষ্ট হয়। অনেক সময় স্থানীয় নেতা-কর্মীদের মধ্যে বিভেদও বাড়ে। এ জন্য এবার দায়িত্বপ্রাপ্ত কিছু নেতা এবং ওই দুই জেলায় বাড়ি এমন কেন্দ্রীয় নেতাদের বাইরে অন্যদের যাওয়ার বিষয়ে খুব একটা উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে না।

অবশ্য কেন্দ্রীয়ভাবে নির্বাচন সমন্বয় করতে দুটি কমিটি গঠন করেছে আওয়ামী লীগ। খুলনার কমিটির নেতৃত্বে আছেন দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফ। আর গাজীপুরে সমন্বয়কের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে আরেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানককে। এই দুজনের নেতৃত্বে আরও পাঁচ-ছয়জন করে নেতা আছেন। তবে কমিটির নেতারা এখনো সেভাবে তৎপর হননি।

জানতে চাইলে মাহবুব উল আলম হানিফ প্রথম আলোকে বলেন, নির্বাচন হবে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ। নাগরিক সুবিধা যিনি দিতে পারবেন, তাঁকেই ভোট দেবে মানুষ। বিএনপির মেয়ররা গত পাঁচ বছরে তা দিতে পারেননি।

দলীয় সূত্র বলছে, কেন্দ্রীয় কমিটিগুলো প্রশাসনিক যোগাযোগ রক্ষায় বেশি গুরুত্ব দেবে। এ ছাড়া ভোটকেন্দ্রের কমিটি ঠিকঠাকভাবে হয়েছে কি না, তা দেখভাল করা, মাঠের চিত্র দলের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের জানানো এবং প্রচারের কৌশল ঠিক করার কাজ করবে কমিটিগুলো।

আওয়ামী লীগের একজন দায়িত্বশীল নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, নারায়ণগঞ্জ, কুমিল্লা ও রংপুরে যেমন নির্বাচন হয়েছে, গাজীপুর ও খুলনায় তেমনি হবে। অর্থাৎ আওয়ামী লীগ জবরদস্তি বা কেন্দ্র দখলের মতো কাজ করবে না। তবে সরকারি দল হিসেবে প্রশাসনিক সুবিধাগুলো কাজে লাগানো হবে। নির্বাচনের সময় এগিয়ে এলে বিএনপির যেসব নেতার বিরুদ্ধে মামলা আছে, তাঁদের কিছুটা দৌড়ের ওপর রাখা হবে।

এই সংবাদটি 1,005 বার পড়া হয়েছে