Monday, 12 Feb 2018 03:02 ঘণ্টা

জেলকোড ও ডিভিশন নিয়ে তামাশা

Share Button

জেলকোড ও ডিভিশন নিয়ে তামাশা

অলিউল্লাহ নোমান
সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধী দলীয় জোট নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া। অসুস্থ, বয়োবৃদ্ধা একজন নারী। ১৯৯১ সাল থেকে যতবার অংশ গ্রহন করেছেন প্রতিটি নির্বাচনে ৫টি করে আসনে বিজয়ী সংসদ সদস্য। এছাড়া দেশের প্রথম মহিলা প্রধানমন্ত্রীও তিনি। সাবেক রাষ্ট্রপতি ও স্বাধীনতার ঘোষকের সহধর্মিনী। স্বামী শহীদ প্রেডিসেন্ড জিয়াউর রহমান শুধু স্বাধীনতার ঘোষনাই দেননি। নেতৃত্ব দিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধে। যুদ্ধে বীরত্বের পুরস্কার স্বরুপ পেয়েছিলেন বীর উত্তম খেতাব। ছিলেন দেশের দ্বিতীয় সেনা প্রধান। সব বিবেচনায় সামাজিক মর্যদার যে কোন মানদন্ডে একজন সম্মানিতা ব্যক্তি তিনি। এখন নাজিমউদ্দিন রোডের নির্জন এলাকার বাসিন্দা।
ঢাকার পুরাতন কেন্দ্রীয় কারাগার। যেখানে দেড় বছর আগেও রাখা হত ২০ হাজার বন্দিকে। সেই বিশাল এলাকায় কয়েকজন কারারক্ষির পাহারায় তিনি একা। পুরাতন শ্যাত শ্যাতে অনেক গুলো পরিত্যক্ত অপরিচ্ছন্ন দালান রয়েছে জেলখানার দেওয়ালে ঘেরা এলাকাটিতে। এই শ্যাত শ্যতে অপরিচ্ছন্ন দালান গুলোর একটিতে রাখা হয়েছে তাঁকে।

কারাগারে বন্দিদের রয়েছে মর্যাদার পার্থক্য। বন্দির সামাজিক মর্যাদা অনুযায়ী প্রাপ্ত সুবিধা নির্ধারণ করা হয়েছে জেলকোডে। ২০০১ সালে অক্টোবরের নির্বাচনে ক্ষমতায় এসেছিল চার দলীয় জোট সরকার। তখন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল জেলকোডে পরিবর্তন আনার। এই পরিবর্তন আনার লক্ষ্যে তৎকালীন আইনমন্ত্রীর নেতৃত্বে কারা সংস্কার সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করা হয়েছিল। তখনই সিদ্ধান্ত হয় কারাগারে বন্দিদের জন্য বিদ্যুতের ফ্যান ব্যবহার এবং টেলিভিশণ দেখার সুযোগ করে দেয়ার বিষয়ে। জেলকোড অনুযয়ী বিশেষ মর্যাদাকে অর্থাৎ ডিভিশন প্রাপ্তির পরিধিও বাড়ানো হয় তখনই। বেগম খালেদা জিয়ার সরকারই কারাগারের বন্দিদের মানবিক বিবেচনা করে অনেক সুযোগ সুবিধা বাড়িয়েছিল। কিন্তু, বেগম খালেদা জিয়াকেই গত ৩ রাত কাটাতে হয়েছে একজন সাধারণ বন্দির মর্যাদায়।

এই রিপোর্ট যখন স্থানীয় সময় সন্ধ্যায় লিখতে বসেছি তখন পত্রিকায় দেখলাম তাঁর ডিভিশন মঞ্জুর হয়েছে মাত্র। এর আগে বৃহস্পতিবার থেকে রবিবার। ৩ রাত ও ৩ দিন অতিবাহিত হয়েছে। এই সময়টুকুতে ডিভিশন প্রাপ্তি নিয়ে চলে চাতুরি। এসব চল চাতুরিতে জিঘাংসা ও প্রতিহিংসার চিত্রই ফুটে উঠেছিল। জিঘাংসা কতটা নি¤œ পর্যায়ে পৌছালে এমন আচরণ করা হতে পারে একজন অসুস্থ, বয়োবৃদ্ধা, সম্মানিতা নারীর সাথে। আধুনিক এই যুগে শেখ হাসিনা জিঘাংসার নতুন নজির তৈরি করলেন।

দুই দিন ধরে বেগম খালেদা জিয়ার ডিভিশন প্রাপ্তির বিষয় নিয়ে নানা বক্তব্য দেখছিলাম পত্রিকার পাতায়। রবিবার সকালে আইজি প্রিজন সাংবাদিকদের বিষয়টি খোলাসা করেছেন। বলেছেন জেলকোডে সাবেক রাষ্ট্রপতি সম্পর্কে বলা রয়েছে। কিন্তু সাবেক প্রধানমন্ত্রী সম্পর্কে জেলকোডে কিছু নেই। এজন্যই সাধারণ বন্দির মর্যাদায় রাখা হয়েছে। কারা কতৃপক্ষ জেলকোড অনুসরণ করেই চলে।

আই জি প্রিজন সাহেবের বক্তব্য পত্রিকায় সকালে দেখে বিষ্মিত হইনি। ফ্যাসিবাদের কাছে এটাই প্রত্যাশিত। তখন চোখের সামনে কারাগারের কিছু ঘটনা ভেসে উঠে। ফ্যাসিবাদের কারাগারের বাসিন্দা হওয়ার সৌভাগ্য আমারও হয়েছিল। জালিম সরকারের অনুগত বিচার ব্যবস্থার জুলুমের শিকার হয়েছিলাম। সেই সুবাদে কারাবাসিন্দা হিসাবে দেখার সুযোগ হয়েছে জেলকোডের দাপট। থানার ওসি, হাসপাতালের ডাক্তার এবং বন রাক্ষস ওসমান গণির সাথে আমার সাক্ষাৎ হয়েছিল ডিভিশনে। অর্থাৎ ‘ভিআইপি’ বন্দিদের জন্য বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত বিল্ডিং ২৬ সেলে। অথচ আজ আইজি প্রিজন সাহেবের মুখে শুনতে হল সাবেক প্রধানমন্ত্রী সম্পর্কে জেলকোডে কিছু বলা নেই। বাঙ্গালকে তিনি হাইকোর্ট দেখালেন।

বুঝলাম, জেলকোডে সাবেক প্রধানমন্ত্রী সম্পর্কে কিছুই বলা নেই। জেলকোডে স্পষ্ট করেই সংসদ সদস্যের কথা বলা রয়েছে। এছাড়া বলা রয়েছে সামাজিক মর্যাদার কথা। সামাজিক মর্যাদা বিবেচনা করেই জেলকোডে এই বিশেষ সুবিধা নির্ধারিত করা হয়েছে। বেগম খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী এবং বিরোধী দলীয় নেত্রী হয়েছিলেন সংসদ সদস্য হওয়ার পর। সংসদ সদস্য না হলে তো আর প্রধানমন্ত্রী হতে পারতেন না। সুতরাং প্রধানমন্ত্রীর বিষয়ে বলা থাকতে হবে কেন!! সাবেক সংসদ সদস্য হিসাবে প্রাপ্ত সুবিধাটা দেওয়া হলেই চলত।

ডিভিশন না দিয়ে বেগম খালেদা জিয়াকে মানষিকভাবে চাপে রাখাই হল মূল লক্ষ্য। মানষিক অপমান ও মানষিক নির্যাতনের লক্ষ্যেই ডিভিশন বঞ্চিত রাখা হয় তাঁকে।

শেষ পর্যন্ত ডিভিশন পেতেও খাটখড় পুড়াতে হয়েছে:

রবিবার সকাল থেকে দৌড়ঝাপ আদালতে। নিতে হয়েছে বিচারিক আদালত অর্থাৎ যে আদালত রায় দিয়েছে সেই আদালতের নির্দেশনা। পত্রিকার খবর অনুযায়ী আদালতের নির্দেশনার আলোকে বিকালে ডিভিশন দেওয়ার বিষয়টি চুড়ান্ত হয়।

বেগম খালেদা জিয়াকি সহসাই জামিন পাচ্ছেন:

রায় হওয়ার আগে অনেকেই প্রশ্ন করতেন, বেগম জিয়াকে কি সাজা দিয়ে দেবে? সংক্ষেপে উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করতাম। সেটা হচ্ছে-শেখ হাসিনা তামাশা করার জন্য মামলা টেনে এ পর্যন্ত আনেননি। শেখ হাসিনা যা করেন সেটা সুনির্দিষ্ট চিন্তা থেকেই করেন। মামলাটা এ পর্যন্ত টেনে আনতে শেখ হাসিনাকে অনেক ঘাম ঝড়াতে হয়েছে। সুতরাং বুঝতেই পারেন। এছাড়া রায়ের তারিখ নির্ধারনরে পরপরই আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ গোলাম মাওলা রনি তাঁর ফেইসবুক স্ট্যাটাস দিয়েছিলেন। বলতে চেয়েছিলেন বেগম খালেদা জিয়াকে সাজা নাও দিতে পারে। আমি তখন নিচে কমেন্টে লিখেছিলাম-‘আপনার নেত্রী তামাশা করার জন্য মামলা টেনে এপর্যন্ত আনেননি।’

জামিনের বিষয়েও একই কথা বলতে হয়। এত সহজে জামিন দিয়ে বের করে দেওয়ার জন্য এই আয়োজন করেনি শেখ হাসিনা। এমনিতেই বেগম খালেদা জিয়া সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনীতিক। এ মামলার রায়ে তাঁর জনপ্রিয়তা আরো বহু গুণ বেড়ে গেছে। জনপ্রিয়তা বাড়ানোর কর্মসূচি নিশ্চয়ই হাসিনা নেননি। সেই হিসাবটা মাথায় রেখেই শেখ হাসিনা প্রতিটি পদক্ষেপ নিচ্ছেন। এপর্যন্ত শেখ হাসিনার রাজনৈতিক চরিত্র বিশ্লেষণ করলে অনেক গুলো বিষয় পরিস্কার হয়ে যায়। যত গুলো পদক্ষেপ নিয়েছেন কোনটাই অগোচালো ছিল না। সবগুলো রাজনৈতিক কর্মসূচি চুড়ান্ত পর্যায় পর্যন্ত সফলতা দেখিয়েছেন শেখ হাসিনা। বিশেষ করে ক্ষমতায় আসার পরই তিনি সুপ্রিমকোর্ট থেকে ম্যাজিষ্ট্রেট কোর্ট পুরো বিচার ব্যবস্থা নিজের কব্জায় নেন। বিচার ব্যবস্থাই হচ্ছে তাঁর কর্মসূচি বাস্তবায়নের মূল হাতিয়ার। সুতরাং এটা বোঝতে এখনো দেরি হচ্ছে শেখ হাসিনার মোকাবেলায় বিরোধী রাজনীতিকদের।

বিরোধী রাজনীতিকরা এখনো বিচার ব্যবস্থায় আস্থার বহি:প্রকাশ দেখাচ্ছেন। আপাদমস্তক আওয়ামী করনের শিকলে আবদ্ধ বিচার বিভাগ রেখে ভবিষ্যতে রাজনৈতিক সাফল্য আশা করা আর বোকার স্বর্গে বাস করা একই কথা।

রাজনৈতিক মামলায় জামিনের এখতিয়ার কিন্তু আদালত বা বিচারকের উপর নির্ভর করে না। সেটা নির্ভর করে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে। রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত যা হবে আদালত সেই আলোকে শুধু আদেশ দেবে। মূল শুনানী হবে শেখ হাসিনার দরবারে। সেখান থেকে নির্দেশনা আসতে হবে। তাঁরপর নির্ভর করবে জামিন ও মুক্তির বিষয়। আইনের কেতাব দিয়ে রাজনীতির মোকাবেলা সম্ভব নয়, সেটা আরেকবার প্রমানিত হল। এর আগে জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের ফাঁসিতেও কিন্তু প্রমানিত হয়েছে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের মোকাবেলা আইন দিয়ে সম্ভব নয়। বেগম খালেদা জিয়ার মামলার একই পরণতি হয়েছে। আইনজীবীরা চেয়েছিলেন আইনের ব্যাখ্যা বিশ্লেষনের মাধ্যমে শেখ হাসিনার রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের মোকাবেলা করবেন। কিন্তু তাঁতে আশায় গুড়েবালি হয়েছে।
জামিন প্রসঙ্গে সর্বশেষ যেটা বলা যায় ডিভিশন না দিয়ে ৩ দিন পার করা কিন্তু সহসা জামিন দেওয়ার লক্ষণ নয়। এর মাধ্যমে সরকার চুড়ান্ত নার্ভ টেষ্ট করছে। কারাগারে নেওয়ার পর থেকে যদি ২দিন দেশ অচল করে রাখা যেত তখন হয়ত: ভিন্ন চিন্তা করতে বাধ্য হত সরকার। বাধ্য করা ছাড়া মুক্তির বিষয়টি আল্লাহই মালুম।

কেউ হয়ত: বলবেন এখন করণীয় কি!

এর উত্তরে শুধু বলা যায় করণীয় হচ্ছে জনগের কাছে ফিরে যাওয়া। বিদেশ নির্ভরতা শুধু নয়। বা ইন্ডিয়ার প্রতি অনুরাগি হয়ে কাজ হবে না। বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ নিয়ে দাড়াতে হবে জনগনের পাশে। বেগম খালেদা জিয়া গত বছর দীর্ঘ দিন লন্ডনে ছিলেন। তখন একটি মামলায় তাঁকে ওয়ারেন্ট ইস্যু করে কুমিল্লার এক আদালত। এ মামলায় ওয়ারেন্ট ইস্যুর পর তিনি দেশে ফিরেন। এটা ছিল তাঁর সাহসী সিদ্ধান্ত। এই সাহসী সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছিল দেশের মানুষ ও নেতাকর্মীরা। স্বাগত জানাতে লাখো মানুষ হাজির হয়েছিলেন এয়ারপোর্টে।
অপ্রাসঙ্গিক এবং অপ্রিয় হলেও এখানে উল্লেখ্য, বেগম খালেদা জিয়া দেশে ফেরার পর লন্ডনে বিএনপি’র ক্ষমতার কেন্দ্র বিন্দুর আশির্বাদপুষ্ট কিছু লোককে বলাবলি করতে শোনা যায় ইন্ডিয়ার সাথে চুড়ান্ত আলোচনা করেই তিনি দেশে ফিরেছেন। গ্রীন সিগন্যাল নিয়েই দেশে গেছেন তিনি। এখন বলতে হয় এটাই কি ইন্ডিয়ার সাথে আলোচনা করে দেশের যাওয়ার ফসল!
সোজা বাংলায় বলা যায় অতি ইন্ডিয়া প্রীতির বহি:প্রকাশ ডেকে আনছে সর্বনাশ।

লেখক: দৈনিক আমার দেশ-এর বিশেষ প্রতিনিধি, বর্তমানে যুক্তরাজ্যে নির্বাসিত

এই সংবাদটি 1,030 বার পড়া হয়েছে