Thursday, 02 Aug 2018 02:08 ঘণ্টা

ঠিক যেন চীনের তিয়েনামেন স্কয়ারে ছাত্রদের উপর তুলে দেয়া ট্যাঙ্কের বহর

Share Button

ঠিক যেন চীনের তিয়েনামেন স্কয়ারে ছাত্রদের উপর তুলে দেয়া ট্যাঙ্কের বহর

বাবা কেন ছোট ছোট  ছেলেমেয়েদের মেরে রক্তাক্ত করলে?     

 

দিনের শুরুতেই সোশ্যাল মিডিয়াতে একটা ভিডিও দেখে নিঃশ্বাস বন্ধ হবার উপক্রম হোল । এটা কি দেখছি ! ঠিক যেন চীনের তিয়েনামেন স্কয়ারে ছাত্রদের উপর তুলে দেয়া ট্যাঙ্কের বহর । ১৯৮৯ সালের ৫ জুন এই হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছিল চায়নার জান্তাবাহিনী আর বাংলাদেশে করছে বাস আর ট্রাক ড্রাইভার নামক দুপেয়ে জন্তুরা । কি ভয়ানক ! মিছিলের জলজ্যান্ত কিশোরদের উপর দিয়ে বেপরোয়া ট্রাক চালিয়ে নিতে তাদের বুক একটুও কাঁপলোনা । ছোট ছোট বাচ্চাগুলো বাঁচলো কি মরলো তার কোন তোয়াক্কা করলোনা ।

এই ফ্রাঙ্কেস্তাইন এক দিনে জন্ম নেয়নি । এই ভয়ঙ্কর প্রজাতির জন্ম হয়েছে শাহজাহান খানের ল্যাবে । মাত্রাতিরিক্ত মেডিসিন, ভিটামিন, সাহস, ক্ষমতা, বিচারহীনতা ইত্যাদি পেয়ে পেয়ে ড্রাইভার নামক এই ফ্রাঙ্কেস্তাইনেরা তাদের সীমা অতিক্রম করে ফেলেছে । তারা এখন কাউকেই তোয়াক্কা করছেনা । দিনের পর দিন নানা অন্যায় করে করে আস্কারা পেয়ে আরো শক্তিশালী দানবে পরিণত হয়েছে । বাস ট্রাকের চাকার নিচে পিষে মেরে ফেলছে অবলীলায় । শুধু তাই নয় প্রানে বেঁচে যাওয়া আহত যাত্রীকে নদীতে ফেলে মৃত্যু নিশ্চিত করছে । এরা মানুষ নয় এরা ঠাণ্ডা মাথার খুনি । এরা বাসে একাকী নারী যাত্রী পেলে দল বেঁধে ধর্ষণ করে হত্যা করছে । আলামত লুকাতে আমার বোনদের মৃতদেহ রাস্তার পাশের ঝোপে, জঙ্গলে, খালে, নদীতে ফেলে দিচ্ছে । এর কোন বিচার হচ্ছেনা । অপরাধীরা ধরা পড়লেও মন্ত্রির হস্তক্ষেপে ছাড়া পেয়ে আরো বেপরোয়া হয়ে নতুন নতুন অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে । কেউ প্রতিবাদ করতে পারবেনা । কথা বললে মুখ বন্ধ করার সুব্যাবস্থা রয়েছে রেডি ।

আজকের ঘটনাতো আরেক কাঠি সরেস । লাইসেন্স দেখতে চাওয়ায় একদম মিছিলের উপর ভ্যান তুলে দিলো । কোথায় আজ গালভরা কথা বলা সুশীল সমাজ ? কোথায় আজ অন্যের পশ্চাদদেশে অঙ্গুলি দেয়া নীতিবাগীশরা ? অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বললে, ন্যায্য দাবীর সমর্থন করলে স্বার্থে টান পড়বে । তাইনা ???

আর আমাদের পুলিশ বাহিনীর কথা কি আর বলবো । তাদের তো মানবিকতা, মনুষ্যত্ব বলে কিছু নেই । তারা শুধুই হুকুমের দাস । কিন্তু সব কিছুর পরেও একটা কথা থেকে যায় । আপনাদেরও তো ঘরে সন্তান আছে । ডিউটি শেষে ঘরে ফিরলে তারাই বাবা বলে কোলে উঠে আপনাদের গলা জড়িয়ে ধরবে । আর তারা যদি প্রশ্ন করে বাবা কেন ছেলেটাকে মেরে রক্তাক্ত করলে ? কেন ছোট ছোট মেয়ে গুলোকে আঘাত করলে ? বলুন তখন কি উত্তর দিবেন ? আমার সাধের বাংলাদেশ কি প্যালেস্টাইন হয়ে গেলো । আপনারা কি ইসরায়েলী জান্তা ?

যে কোমলমতি মেয়েটার গায়ে বাবা-মা কখনো ফুলের টোকাটি দেয় নাই তাদেরকে রাইফেলের বাট আর বুটের আঘাতে জর্জরিত করেছেন । আপনারা শুধু তাদের গায়ে আঘাত করেননি, তাদের মনের মধ্যে যে আঘাত দিয়েছেন তার দাগ কখনো মুছার নয় । বিবেক দিয়ে একটু ভেবে দেখবেন । সামনের দিন গুলোতে মানসিকতায় চেঞ্জ এনে আচরণেও একটু বদল আনুন । ছোট ছোট ছেলেমেয়ে গুলোর ন্যায্য এবং যৌক্তিক দাবী আদায়ের আন্দোলনকে অস্ত্র আর ক্ষমতার জোরে থামিয়ে না দিয়ে মানুষের কাতারে নেমে আসুন ।
মনে রাখবেন ওরা একদিনে রাস্তায় নামেনি । ওরা হারিয়েছে ওদের বন্ধু, ভাই বোনেদের । রাস্তায় নয় ফুটপাতে বাসের জন্য দাঁড়িয়েও বাঁচতে পারেনি । ঘাতক বাসের বেপরোয়া ড্রাইভারের জন্য প্রান দিতে হোল ফুলের মতো নিস্পাপ স্কুল ছাত্রছাত্রীকে । আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীদের নিজেদের ও জীবনের কোন নিরাপত্তা নেই । এখন মন্ত্রী তার তথাকথিত পরিবহন শ্রমিক বাহিনীকে লেলিয়ে দিয়েছে । পুলিশের পাশাপাশি এই অমানুষেরা এখন নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের উপর হামলে পড়ছে । এখন মায়েরা এগিয়ে আসুন সন্তানদের পাশে দাঁড়ান ।

আর নির্লজ্জ শাজাহান খানের কথা কি আর বলবো । শুধু মাত্র এই লোকটার ক্ষমতার লোভের কারনে বাংলাদেশ হারিয়েছে অনেক গুণী, মেধাবী সম্ভাবনাময় সন্তানদের । আর এরা তো নিছক পাবলিক বাসে চড়া স্কুল ছাত্রছাত্রী । এরা মরলে উনার কি বা আসে যায় । সন্তান হারানোর বেদনা উনি কিভাবে বুঝবেন । দাঁত কেলিয়ে উনিতো হাসবেনই । হায়া লজ্জা কিছুই তার নেই । সন্তানহারা মা বাবার কান্না তার মনকে ছুঁতে পারবেনা । এসব আন্দোলন তার কেশাগ্রও স্পর্শ করবে না । ক্ষমতার দাপটে তিনি অন্ধ । কিন্তু আজ সময় এসেছে দিবানিদ্রা ত্যাগ করে চোখ মেলে তাকানোর । সময় এসেছে নির্দ্বিধায়, নির্ভয়ে সাদাকে সাদা কালোকে কালো বলার । এখনি সময় পরিবহনের দানবকে নিয়ন্ত্রন করার । নইলে এই ফ্রাঙ্কেস্তাইন অচিরেই পুরো জাতির জন্য অভিশাপ হবে ।

মাহবুবা জেবিন
প্রবাসী লেখক, সাংবাদিক ।

এই সংবাদটি 1,005 বার পড়া হয়েছে