Saturday, 23 Jun 2018 04:06 ঘণ্টা

৪ সেনা কর্মকর্তাকে ডিঙিয়ে বিতর্কিত আজিজকেই করা হলো সেনাপ্রধান

Share Button

৪ সেনা কর্মকর্তাকে ডিঙিয়ে বিতর্কিত আজিজকেই করা হলো সেনাপ্রধান

সেনাবাহীনীর ৪ সেনা কর্মকর্তাকে ডিঙিয়ে বিতর্কিত আজিজকেই করা হলো সেনাপ্রধান। সন্ত্রাসী জোসেফের বড় ভাই সাবেক বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আজিজ আহমদকে নতুন সেনাপ্রধান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বিশ্বস্তসূত্রে প্রাপ্য তথ্য মতে, সেনাবাহিনীর শীর্ষ ৪ সেনা কর্মকর্তা ডিঙিয়ে রাষ্ট্রপতি মেজর জেনারেল আজিজ আহমদকে সেনা প্রধান হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন। এতে করে দেশের সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে ক্ষোভ বিরাজ করছে। মেজর জেনারেল আজিজ আহমদকে সরকার দলীয় ও বিশেষ এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য নিয়োগ দেয়া হয়েছে বলে দাবি করেছে দেশের অন্যতম বিরোধীদল বিএনপি। সেনাবাহিনীর অন্যতম শীর্ষ ৪ সেনা কর্মকর্তা হলেন লেফটেনেন্ট জেনারেল আনোয়ার হোসেন, লেফটেনেন্ট জেনারেল চৌধুরী হাসান সারওয়ার্দী, লেফটেনেন্ট জেনারেল মাহফুজুর রহমান, লেফটেনেন্ট জেনারেল মোহাম্মদ নাজিমউদ্দিন। লেফটেনেন্ট জেনারেল আজিজ আহমেদ এর অবস্থান ছিল ৫ম পর্যায়ে। বর্তমান সরকারের পছন্দের লোক বলেই তাকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে বলে দেশ জুড়ে আলোচনার ঝড় বইছে।

বিডিপ্রেস টোয়েন্টিফোর ডটকম এর পাঠকের জ্ঞাতার্থে ক্রমানুসারে সেনাবাহিনীর ৫ শীর্ষ কর্মকর্তার কর্মদক্ষতা তুলে ধরা হলো-

১। লেফটেনেন্ট জেনারেল আনোয়ার হোসেন – আনোয়ার হোসেন ১৯৭৯ সালের ২৩ ডিসেম্বর ১ম বিএমএ কোর্সে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর আর্টিলারিতে কমিশনপ্রাপ্ত হন। আনোয়ার হোসেন তার দীর্ঘ চাকরীজীবনে নবম আর্টিলারি ব্রিগেড, কমান্ডেন্ট আর্টিলারি সেন্টার এবং স্কুল, সেনা সদর দপ্তর অধীনে সাধারণ শাখার পরিচালক, জিওসি ৩৩ পদাতিক ডিভিশন এবং কুমিল্লা এরিয়া কমান্ডার। তিনি সাবেক জিওসি আর্মি ট্রেনিং এন্ড ডক্টরিনের কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি ৩০ জুন ২০১১ থেকে ৫ ডিসেম্বর, ২০১২ পর্যন্ত বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের মহাপরিচালক হিসেবে কাজ করেছেন। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর অঙ্গ প্রতিষ্ঠান ডাইসেল প্ল্যান্টের পরিচালনা পর্ষদের ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে কর্মরত ছিলেন এবং তিনি বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরির পরিচালনা পর্ষদের ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন। তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কোয়ার্টার মাস্টার জেনারেল হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ২০১৮ সালে ৮ জানুয়ারি বাংলাদেশ সেনাবাহিনী থেকে অবসরগ্রহণ করেন।

২। লেফটেনেন্ট জেনারেল চৌধুরী হাসান সারওয়ার্দী – তিনি ১৯৬০ সালে চট্টগ্রামের সন্দীপ জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৭৯ সালে তিনি দ্বিতীয় বিএমএ লং কোর্স থেকে পদাতিক বাহিনীতে কমিশনপ্রাপ্ত হন। হাসান সারওয়ার্দী একটা পদাতিক ব্যাটিলিয়ন, রাইফেল ব্যাটিলিয়ন, রাইফেল সেক্টর এবং পদাতিক ব্রিগেড কমান্ড করেছেন। তিনি ডিভিশন এবং সেনা সদর দপ্তরে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমীতে ব্যাটিলিয়ান কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন এছাড়া তিনি বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের অপারেশন পরিচালক এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সামরিক পরিদপ্তরে পরিচালক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তিনি নন কমিশনার অফিসার একাডেমীর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং প্রধান প্রশিক্ষক ছিলেন। তিনি ২০১০ সালে এপ্রিল মাসে মেজর জেনারেল পদে পদোন্নতি লাভ করেন। সামরিক গোয়েন্দা বিভাগের পরিচালকের দায়িত্ব পালন করবার পর তাকে বাংলাদেশ আনসার ভিডিপির মহাপরিচালক হিসেবে সেনাবাহিনী থেকে প্রেষণে পাঠানো হয়। পরবর্তীতে তাকে বাংলাদেশ প্রফেশনাল ইউনিভারসিটির ভাইস চ্যান্সেলর হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। তিনি ঢাকার লগ এরিয়া কমান্ডার এবং এস এস এফের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন ২৭ নভেম্বর, ২০১১ থেকে ১০ সেপ্টেম্বর ২০১২ পর্যন্ত। তিনি নবম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি ছিলেন ২০১২ থেকে ২০১৫ পর্যন্ত। তাকে পরবর্তীতে লেফটেনেন্ট জেনারেল পদে পদোন্নতি দিয়ে ময়মনসিংহ ক্যান্টনমেন্টে জিওসি আর্মি ট্রেনিং এন্ড ডক্টরিনের কমান্ডার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। ২০১৫ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারিতে ন্যাশনাল ডিফেন্স কলেজের কমান্ড্যান্ট হিসেবে যোগদান করেন।

৩। লেফটেনেন্ট জেনারেল মাহফুজুর রহমান – ১৯৬১ সালে রাজশাহীতে জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৮১ সালে বাংলাদেশ মিলিটারি থেকে কমিশন প্রাপ্ত হন ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট থেকে। তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর একটা পদাতিক ব্যাটিলিয়ন, দুইটা পদাতিক ব্রিগেড এবং একটি ডিভিশন কমান্ড করেছেন । তিনি ব্রিগেড মেজর, জেনারেল স্টাফ অফিসার গ্রেড ১ এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ডাইরেক্টর মিলিটারি অপারেশন হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এছাড়া তিনি বাংলাদেশ মিলিটারি একাডেমীর প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করেছেন, ন্যাশনাল ডিফেন্স স্টাফ কলেজের পরিচালক ছিলেন ওয়ার কোর্সের। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইনফিন্ট্রির এবং ট্যাক্টসি স্কুলের কমান্ডেন্ট এবং এ্যাডজুটেন্ট জেনারেল ছিলেন। তিনি ট্রাস্ট ব্যাংকের ভাইস প্রেসিডেন্ট ছিলেন। ২০১৬ সালে তাকে প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার হিসেবে নিয়োগ প্রদান করা হয়।

৪। লেফটেনেন্ট জেনারেল মোহাম্মদ নাজিমউদ্দিন – তিনি ৮ম দীর্ঘ কোর্সে অংশগ্রহণ করে ১৯৮৩ সালে ১০ জুন, বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে কমিশনপ্রাপ্ত হন। এর আগে তিনি ৫৫ পদাতিক ডিভিশনের জিওসি এবং যশোর এরিয়ার কমান্ডার, বাংলাদেশ আনসার ভিডিপির মহাপরিচালক এবং মিরপুর স্টাফ কলেজের অন্যতম পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর চিফ অব জেনারেল স্টাফ ( সিজিএস ) হিসেবে কর্মরত।

৫। লেফটেনেন্ট জেনারেল আজিজ আহমেদ – সদ্য ঘোষিত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নতুন সেনাপ্রধান। তার জন্ম ১৯৬১ সালের ১ জানুয়ারি নারায়ণগঞ্জে। তার গ্রামের বাড়ী চাঁদপুরে। তার বাবার নাম আব্দুল ওয়াদুদ এবং মাতার নাম রেনুজা বেগম। তিনি ১৯৭৫ সালে মোহাম্মদপুর সরকারী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পাশ করে, তারপর নটরডেম কলেজে ভর্তি হন, ১৯৮০ সালে টেক্সটাইল কলেজ থেকে ডিপ্লোমা ডিগ্রি লাভ করেন এবং ১৯৮৩ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএ পাশ করেন।

তিনি ৮ম বিএমএ দীর্ঘদেয়াদি কোর্স শেষে ১৯৮৩ সালের ১০ জুন সেনাবাহিনীর আর্টিলারি কোরে কমিশনপ্রাপ্ত হন। তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামে জিএসও-৩ (অপারেশন), পদাতিক ব্রিগেডের ব্রিগেড মেজর, সেনাসদর প্রশিক্ষণ পরিদপ্তরের গ্রেড-২ এবং সেনাসদর, বেতন ও ভাতা পরিদপ্তরের গ্রেড-১ স্টাফ অফিসারের দায়িত্ব পালন করেন। তিনি একটি আর্টিলারি ইউনিট, একটি বিজিবি ব্যাটালিয়ন, বিজিবির একটি সেক্টর, স্বতন্ত্র এয়ার ডিফেন্স আর্টিলারি ব্রিগেডসহ মোট দুটি আর্টিলারি ব্রিগেড এবং একটি পদাতিক ডিভিশন ( কুমিল্লার ৩৩ পদাতিক ডিভিশন) কমান্ড করেন। ১৮ জুন, ২০১৮ তাকে তিন বছরের জন্য সেনাপ্রধান হিসেবে নিয়োগ প্রদান করেন।

জেনারেল আজিজ আহমেদের পারিবারিক পরিচিতি –

আজিজ আহমেদের বাবা বিমান বাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা ওয়াদুদ আহমেদে মাতা রেনুজা বেগম। পাঁচ ভাইর মাঝে আজিজ আহমদ দ্বিতীয়।
বড় ভাই হারিস আহমেদ, ইন্টারপোলের লাল তালিকায় থাকা শীর্ষ সন্ত্রাসীদের একজন। ১৯৯৬ সালের ৭ মে খুন হন রাজধানীর মোহাম্মদপুরের ব্যবসায়ী মোস্তাফিজুর রহমান মোস্তফা হত্যা মামলার আসামী ঐ ঘটনায় নিহতের স্ত্রীর করা মামলায় ২০০৪ সালের ২৫ এপ্রিল হারিস আহমেদ কে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ দেন নিম্ন আদালত। যদিওবা হারিস পালাতক আছে ১৯৯৬ সাল থেকে। স্বৈরশাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের শাসনামলে হারিস আহমেদ নিজেকে মোহাম্মদপুর এলাকায় জাতীয় পার্টির নেতা হিসেবে পরিচয় দিতেন। এরশাদ সরকারের পতনের পর তিনি নিজের পরিচয় দিতে শুরু করেন মোহাম্মদপুর থানা যুবলীগের নেতা হিসাবে। ঢাকার ৪৪ নম্বর ওয়ার্ড থেকে কমিশনার পদে নির্বাচনও করেছিলেন তিনি।

দ্বিতীয় ভাই আজিজ আহমদ, তৃতীয় ভাই সাঈদ আহমেদ টিপু ১৯৯৯ সালের ১৩ই মার্চ এয়ারপোর্ট রোডে সন্ত্রাসীদের হাতে খুন হন। চতুর্থতম ভাই আনিস আহমেদ মোস্তফার মামলায় সাজা প্রাপ্ত যাবজ্জীবন কারদন্ড প্রাপ্ত এবং ঢাকার মোহাম্মদপুরের বর্তমান মিজান কমিশনারের ছোট ভাই কামাল হত্যা মামলার আসামী। নিম্ন আদালতের বিচারের ফাঁসির দন্ডাদেশ হয়েছে। সেও পালাতক ভারতে।

ছোট ভাই, তোফায়েল আহমেদ জোসেফ। ১৯ বছর আগে জোসেফ যখন গ্রেপ্তার হন, তার নামে ঢাকার বিভিন্ন থানায় তখন চাঁদাবাজি, খুন, অবৈধ অস্ত্র বহনের অভিযোগে অন্তত ১১টি মামলা। ১৯৯৬ সালের ৭ মে খুন হন রাজধানীর মোহাম্মদপুরের ব্যবসায়ী মোস্তাফিজুর রহমান।
ওই ঘটনার পরপরই পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন যোসেফ। এ ঘটনায় নিহতের স্ত্রীর করা মামলায় ২০০৪ সালের ২৫ এপ্রিল যোসেফ কে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেন এ রায়ের বিরুদ্ধে কারাগারে থাকা আসামীরা জেল আপিল করে। ২০০৭ সালে ওই আপিল ও ডেথরেফারেন্সের শুনানি শেষে নিম্ন আদালতের রায় বহাল রাখেন হাইকোর্ট।
এরপর আপিল বিভাগে আসে মামলটি এবং আজিজ আহমদ বিজিবি প্রধান, আপিলে প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহার নেতৃত্বে ৪ বিচারপতির আপিল বেঞ্চ ২০১৫ সালের ৯ ই ডিসেম্বর জোসেফের মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে যাবজ্জীবন সাজা দেন। এছাড়া অস্ত্র মামলায় তাঁর ১২ বছরের কারাদণ্ড হয়।

২০ বছর যাবৎ কারাগারে থাকলেও ভাই বিজিবি প্রধান হলে কারাগারে বন্দি জোসেফ চিকিৎসার নাম করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে কারাকক্ষে ছিলেন আয়েশি জীবন। ২০১৫ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর থেকে এই ‘ভিআইপি রোগী’ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের কারা কক্ষে আছেন আরাম-আয়েশে। যাঁকে খুশি কারাকক্ষে ডেকে নিচ্ছেন, দল বেঁধে আড্ডা দিচ্ছেন।

যাবজ্জীবন সাজার আসামি নব্বইয়ের দশকের আলোচিত শীর্ষ সন্ত্রাসী তোফায়েল আহমেদ জোসেফ রাষ্ট্রপতির ক্ষমায় মুক্তি পেয়েছেন। জোসেফের মা রেনুজা বেগম ৭ জুন ২০১৭ তাঁর সন্তানের সাজা মওকুফের জন্য আবেদন করেছেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হয়ে আইন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় হয়ে রাষ্ট্রপতি নিকট উপস্থাপন করা হয়। রাষ্ট্রপতি খুশি হয়ে তাকে শুধু ক্ষমাই করে নাই সাথে বিদেশ গিয়ে চিকিৎসার অনুমতি দিয়েছে এবং গোপনে চলে গেছেন বিদেশে। ৩ শীর্ষ সন্ত্রাসীর ভাই লে. জেনারেল আজিজ আহমদ। আজিজ আহমদ ছাড়া বাকী ৩ ভাই হত্যা মামলার দন্ডপ্রাপ্ত আসামী।

এই সংবাদটি 1,187 বার পড়া হয়েছে